×
শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬ শুক্রবার, ০০ ১৪৩২
শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬ শুক্রবার, ০০ ১৪৩২

সাহিত্যের রয়েছে সার্বজনীন এবং বিশ্বরূপ । সাহিত্য একক কোন ভাষার সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকেনা। যে সাহিত্য ভাষার গণ্ডি অতিক্রম করতে পারে তখনই সেটি হয়ে ওঠে বিশ্ব মানবতার অগ্রদূত। বাংলা সাহিত্য এর ব্যতিক্রম নয় , সৃষ্টির শুরু থেকে বাংলা সাহিত্যের রয়েছে প্রাণবন্ত রূপ মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতি এবং সামগ্রিক চেতনার এক অপূর্ব সম্মেলন ঘটেছে। অতীত চর্যাপদের সহজিয়া পদাবলী হতে শুরু করে মানবতাবাদের দিশারী বাউল লালন শাহের অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধ এবং মানব দর্শন । বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ” বিশ্ব ভাবনা ” বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের দ্রোহের সুর , কবি জীবনানন্দ দাশের নিসর্গ ও নিঃসঙ্গতা পরবর্তীতে হুমায়ূন আহমেদের মত দৈনন্দিন জীবনে গল্পের রূপকার – বাংলা সাহিত্য ধারাকে মানুষের গভীরতম বোধ, দ্বন্দ্ব এবং সংঘাত এবং তা থেকে মুক্তির উপায় অনুধাবনের প্রয়াস হিসাবে শব্দে রুপ দিয়েছেন ।

এত কথার ভিড়ে, মনের কোণে প্রশ্ন জাগতে পারে- এত সমৃদ্ধ এত ঐতিহ্যবাহী সাহিত্য কেন বিশ্বের দরবারে যথা উপযুক্ত সম্মান পায়নি? উত্তরটি জটিল , কিন্তু রয়েছে অবারিত সম্ভাবনার বীজ। আলোচ্য প্রবন্ধে উপস্থাপন করা যায় বাংলা সাহিত্য বিশ্বমঞ্চে কিভাবে সুদৃঢ় জায়গা করে নিতে পারে এবং তার অবস্থান গভীর করে তুলতে পারে ‌।

বাংলা সাহিত্যের অসংখ্য সাহিত্য সমাহার এখনো ইংরেজি সহ অন্যান্য ভাষায় অনূদিত হয়নি , অথবা অনুবাদ হয়ে থাকলেও তা সাহিত্যের গভীরতা ও সাংস্কৃতিক স্পর্শ বহন করতে পারেনি। বাংলা সাহিত্যের জন্য এখানে রয়েছে একটি বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা, কিন্তু অপরপক্ষে রয়েছে বিশাল এক সম্ভাবনা। যদি রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি উদ্যোগে একটি সুসংগঠিত, সুসংহত অনুবাদ প্রকল্প গড়ে তোলা যায়, যেখানে কেবল প্রবন্ধ বা উপন্যাস নয় , লোক সাহিত্য, নাটক, আত্মজীবনী সাহিত্য এবং শিশুতোষ সাহিত্য ও স্থান পায় তবে বাংলা সাহিত্য বহু ভাষিক পাঠকের নিকট পৌঁছাতে পারবে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে সাহিত্য পুরস্কার এবং সাহিত্য ফেস্টিভ্যালে বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং তাদের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য অনূদিত কাজ প্রদর্শনের ক্ষেত্রে যথা উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা । এটি হতে পারে বাংলা সাহিত্য প্রচার এবং প্রসারে কার্যকারী পদক্ষেপ এবং মাইলফলক। এর পাশাপাশি পেশাদার অনুবাদক তৈরি এবং তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার প্রয়োজন।

বিশ্বমঞ্চে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে চেতনাবোধ সংযোগে যখন বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব ও মানব ধর্ম “সম্পর্কে লিখেছেন , কিংবা বাউল লালন শাহ যখন একতারা’তে সুর ধরেছেন – ” ধর্মের মাঝে হিন্দু মুসলমান, দেখেনে একবার ঘুরায়ে”। এক্ষেত্রে তারা শুধুমাত্র নিজের পরিমণ্ডল বা নিজের সাহিত্য আঙ্গিনা নিয়ে ভাবেননি তারা রোপণ করেছেন বিশ্ব নাগরিকতার বীজ, জ্বালিয়েছে অপার সম্ভাবনার আলো। যদিও এখন আমরা বুঝতে সেটি অক্ষম এ কারণে আমরা দুর্ভাগ্য জাতি যাদের সমৃদ্ধ সাহিত্য থাকতেও বিশ্বমঞ্চে আমাদের উপযুক্ত জায়গা হয়নি । এ দোষ অন্য কোন জাতির নয় , এ দোষে দোষী আমরা স্বয়ং বাঙালির জাতিসত্তা প্রকাশ করতে আমরা হীনমন্যতায় অনুভব করি, যা মোটেও সম্মানের নয় বরং অপমানে কারণ- আজকে বিশ্বময় যে মানবতার সংকট , অভিবাসন নীতি , জলবায়ু পরিবর্তন বা বৈষম্যের প্রসঙ্গে বাংলা সাহিত্যের অন্তর্নিহিত বার্তা গুলো গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক , কিন্তু সেটা ভাবার আমাদের সময় কোথায়?? বলা হয়ে থাকে, কোন জাতির সাহিত্য সময়ের সাক্ষ্য বহন করে, এক্ষেত্রে বাংলা সাহিত্য হতে পারে এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত যা প্রান্তিক পর্যায়ে অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে সার্বজনীন রূপ নিয়েছে। সঙ্গত কারণেই বিশ্বমঞ্চে বাংলা সাহিত্য অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।

বাংলা সাহিত্যের এক অপরূপ বৈচিত্র ধারা হল লোক সাহিত্য এর ভাব ছন্দ- প্রকরণ এবং গভীর দার্শনিক ভাবনা লুকায়িত রয়েছে এই ধারা গুলোকে আধুনিক মিডিয়ার মাধ্যমে যদি সুন্দরভাবে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করা যেত তাহলে বিশ্ব সাহিত্যে নতুন এক যুগের সূচনা হতো। বাউল লালন শাহ, হাসন রাজা, বিজয় সরকার বা রাধারমন দত্তের গানের মধ্যে যে জাতিসত্তা প্রস্ফুটিত হয় এবং যে ধর্ম নিরপেক্ষতা উঠে আসে । তা পৃথিবীর যেকোনো চিন্তাশীল দর্শকের হৃদয় আকর্ষণ এবং আবেগ আপ্লুত করতে সক্ষম।

বাংলা সাহিত্য বিশ্বের বুকে তুলে ধরার জন্য নীতি নির্ধারক পর্যায়ে যে সকল কার্যক্রম গ্রহণ করা হয় তা যথেষ্ট নয়। বিশ্বমঞ্চে বাংলা সাহিত্য উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে বাংলা সাহিত্য সম্মেলন এবং বাংলাদেশে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যের উপর আন্তঃসংস্কৃতি গবেষণা পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরী। সকল পর্যায়ের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর বাংলা বিভাগ রয়েছে এই বিভাগ গুলোর সাথে আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে গবেষণা কার্যক্রম গ্রহণ করা উচিত। সকল পর্যায়ের শিক্ষা অনুরাগী এবং সংস্কৃত অঙ্গনের সাথে সম্পৃক্ত সকলের ঐকান্তিক সহযোগিতায় বাংলা সাহিত্যের বিশ্বমঞ্চে নব অভিযাত্রা শুরু হতে পারে।

আধুনিক মিডিয়া এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেসব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম রয়েছে ,সেগুলো প্রচারের শক্তিশালী মাধ্যম সাহিত্যের ক্ষেত্র এর ব্যতিক্রম নয় । বাংলা সাহিত্যের মানসম্মত অনুবাদ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। এর জন্য ই-বুক , অডিও বুক ও সহজে প্রবেশ করা যায় এমন অনলাইন আর্কাইভ গড়ে তোলা যেতে পারে যা হবে ফলপ্রসু। যেমন- বাংলা সাহিত্যের একটি বিশ্বমানের ডিজিটাল লাইব্রেরী তৈরির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাহিত্য প্রেমীদের কাছে সহজে বাংলা সাহিত্যের মর্মবাণী পৌঁছে যেতে পারে এটি সহজ বর্তমান প্রেক্ষাপটে।

বাংলা সাহিত্যের ঐতিহাসিক দলিল সমূহ ও ভিডিও আর্কাইভ অনলাইন ভিত্তিক করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গবেষণার আওতায় আনা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এবং কার্যকারী হবে। ইউটিউব সহ সোশ্যাল মিডিয়াতে সাহিত্যের ভিত্তিতে নাটক, কবিতা ,গান লোক সাহিত্য বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা বিশ্ববাসীর কাছে নতুন রূপে হাজির করা যেতে পারে যা হবে সময় উপযোগী এবং নান্দনিক।

বাংলা ভাষা এবং সাহিত্য কেবল একটি জাতির আবেগ অনুভূতির বাহন নয় – এটি মানবিকতা, সাম্য ,চেতনার বহিঃপ্রকাশ এবং মুক্তচিন্তা ধারক ও বাহক। সঙ্গত কারণেই বাংলা সাহিত্য যদি যথার্থ রূপে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করা যায় তাহলে বাংলা সাহিত্য শুধুমাত্র একটি জাতি, দেশ এবং ভাষার প্রতিনিধিত্ব করবে না – এটি বিশ্ব মঞ্চে হয়ে উঠবে নৈতিক বোধের প্রতিনিধি এবং প্রতিমূর্তি। এর জন্য চাই , সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা , অনুবাদের ক্ষেত্রে সর্বাধিক আন্তরিকতা এবং একাডেমিক ক্ষেত্রে আন্তঃসংস্কৃতি ও গবেষণা।

নবজাগরণের এই সময় -বাংলা সাহিত্যের ধারা যোগ্য জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার উত্তম সময়। সবার মনের কোণে ধ্বনি হাওয়া উচিত– ভাষা যেখানে থমকে যায়, সাহিত্যের প্রাণবন্ত যাত্রা সেখান থেকে শুরু হয়–

বিষয়ঃ

প্রবন্ধ

1টি মন্তব্য

সুকদেব কুমার পাল

সুকদেব কুমার পাল

7 months আগে

খুব সুন্দর লিখনি হয়েছে। এভাবে এগিয়ে যাও আরো সুন্দর কিছুর প্রত্যাশায় রইলাম।

মন্তব্য করুন

আবশ্যক ঘরসমূহ * চিহ্নিত করা হয়েছে

সম্পর্কিত