ইতিহাস আর কিংবদন্তি যেখানে মিলেমিশে একাকার, ঝিনাইদহের বুকে তেমনি এক নীরব সাক্ষী হয়ে আছে বিশাল ঢোল সমুদ্র দীঘি। এর শান্ত জলের দিকে তাকালে আজও কি একটি মায়াবী মুখ ভেসে ওঠে? যে দিঘির প্রতিটি ঢেউয়ের সাথে জড়িয়ে আছে একজন প্রতাপশালী রাজার প্রতিপত্তি, রাজ্যের মানুষের জন্য তাঁর ভালোবাসা এবং এক রানীর আত্মত্যাগের করুণ আখ্যান। এটি শুধু একটি জলাশয় নয়, এটি একটি গল্প—ত্যাগ, ভালোবাসা আর দীর্ঘশ্বাসের গল্প। গল্পটি শুনি চলুন আগে।
প্রতাপশালী রাজা মুকুট রায় ও তাঁর কীর্তি
ঝিনাইদহের বিজয়পুর ছিল যাঁর রাজধানী, তিনি রাজা মুকুট রায়। শুধু নামে নন, কাজেও তিনি ছিলেন প্রতাপশালী। কথিত আছে, তাঁর বাহিনীতে ছিল ১৬ হল্কা হাতি ও ২০ হল্কা অশ্ব, যা ছাড়া তিনি রাজদরবারের বাইরে যেতেন না। তবে তাঁর প্রতাপ শুধু সৈন্য-সামন্তেই সীমাবদ্ধ ছিল না। খাঁন জাহান আলীর মতোই তিনি ছিলেন একজন প্রজাদরদী শাসক। রাস্তা নির্মাণ এবং জলাশয় খনন করতে করতেই তিনি তাঁর রাজ্যের সীমানা বাড়াতেন। প্রায় ৫২ বিঘা জমির উপর খনন করা ঢোল সমুদ্র দীঘি তাঁরই এক অমর কীর্তি, যা আজও ঝিনাইদহের সর্ববৃহৎ দীঘি হিসেবে পরিচিত।
যে কিংবদন্তির জলে জন্ম এই দিঘির
ঢোল সমুদ্র দীঘির বিশালতার পেছনে লুকিয়ে আছে এক করুণ লোকশ্রুতি। একবার রাজা মুকুট রায়ের রাজ্যে নেমে আসে ভয়াবহ জলকষ্ট। শুকিয়ে যায় নদী-নালা, খাল-বিল। প্রজাদের হাহাকার দেখে রাজা সিদ্ধান্ত নিলেন এক বিশাল দীঘি খননের। হাজার হাজার লোক দিনরাত পরিশ্রম করে মাটি কাটতে লাগল, কিন্তু দিঘিতে এক ফোঁটা জলও উঠল না।
হতাশ রাজা একদিন রাতে স্বপ্ন দেখলেন, তাঁর সহধর্মিণী, প্রজাদের প্রিয় রাণী যদি দিঘিতে নেমে পূজা দেন, তবেই জলের দেখা মিলবে। প্রজাদের মঙ্গলের জন্য রাণী হাসিমুখে রাজি হলেন। পূজার অর্ঘ্য হাতে নিয়ে তিনি ধীর পায়ে নেমে গেলেন শুকনো দিঘির তলদেশে। যেই না তিনি ইষ্টদেবতার চরণে পূজা নিবেদন করলেন, অমনি প্রবল বেগে জল উঠতে শুরু করল। পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার প্রজা আনন্দে আত্মহারা হয়ে বাদ্য-বাজনা আর ঢোল বাজাতে শুরু করল। কিন্তু সেই উৎসবের ঢোলের শব্দের আড়ালে হারিয়ে গেল এক করুণ আর্তনাদ। প্রবল জলের স্রোতে সবার অলক্ষ্যে অথৈ জলরাশির গভীরে তলিয়ে গেলেন প্রজাহিতৈষী রাণী। সেই ঢোলের শব্দ আর সমুদ্রের মতো বিশাল জলরাশি মিলেমিশে দিঘিটির নাম হলো ‘ঢোল সমুদ্র দীঘি’।
ইতিহাসের ভাঙা আয়নায় রাজার শেষ পরিণতি
কিংবদন্তির আখ্যানের মতোই রাজার শেষ জীবনও ছিল অত্যন্ত করুণ। তিনি বাড়ীবাথানের যুদ্ধে নবাব ও পাঠানদের সম্মিলিত বাহিনীর কাছে পরাজিত ও বন্দী হন। যদিও নবাব পরে তাঁর পরিচয় জেনে তাঁকে মুক্তি দিয়েছিলেন, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। রাজার মৃত্যু অনিবার্য ভেবে তাঁর পরিবারের সকল সদস্য আত্মহত্যা করেন। রাজার কন্যার আত্মত্যাগের স্থানটি আজও ‘কন্যাদহ’ এবং রাণীদের আত্মহত্যার স্থান ‘দুসতীনের দহ’ নামে পরিচিত, যা রাজার জীবনের ট্র্যাজেডিকে আজও বহন করে চলেছে।
বর্তমানের বিনোদন কেন্দ্র ও প্রত্নতাত্ত্বিক সম্ভাবনা
শতাব্দী পেরিয়ে ঢোল সমুদ্র দীঘি আজ ঝিনাইদহের অন্যতম প্রধান বিনোদন কেন্দ্র। এর শান্ত পরিবেশ আর জলের হাতছানি মানুষকে আজও আকর্ষণ করে। তবে এর ইতিহাস শুধু লোককথাতেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মনে করেন, দিঘির দক্ষিণের মাটির স্তূপের নিচে রাজা মুকুট রায়ের রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ বা অন্য কোনো ঐতিহাসিক নিদর্শন লুকিয়ে থাকতে পারে, যা উন্মোচন করতে পারে ইতিহাসের নতুন কোনো অধ্যায়।
ইতিহাস, কিংবদন্তি, আনন্দ আর বিষাদের এক অদ্ভুত মিশ্রণ এই ঢোল সমুদ্র দীঘি। এটি একাধারে একজন রাজার ক্ষমতার প্রতীক, একজন রানীর ভালোবাসার স্মৃতিস্তম্ভ এবং হাজারো মানুষের জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস। আজও দিঘির জলে কান পাতলে কি সেই ঢোলের শব্দ শোনা যায়? অথবা শান্ত দুপুরে জলের দিকে তাকালে কি এক রানীর করুণ মুখচ্ছবি ভেসে ওঠে? কিছু উত্তর হয়তো ইতিহাস দেবে, আর কিছু রয়ে যাবে দিঘির অতল গভীরে, কিংবদন্তির মতো।

মন্তব্য করুন