আজ আমরা যে আধুনিক শিক্ষার আলোয় আলোকিত, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল শত শত বছর আগে, ইংরেজ শাসনামলে। সেই সময়ে প্রতিষ্ঠিত কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ছড়িয়ে দিচ্ছে জ্ঞানের আলো। এই প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু ইট-পাথরের দালান নয়, এগুলো আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বাতিঘর। চলুন, আজ জেনে নিই ইংরেজ আমলে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের সেরা ১০টি প্রাচীনতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে, যারা আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
নিচে সেই ঐতিহাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি তালিকা তাদের প্রতিষ্ঠা সাল অনুযায়ী তুলে ধরা হলো:
১. রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল (১৮২৮)
- প্রতিষ্ঠার সময়কার নাম: রাজশাহী জিলা স্কুল
- অবস্থান: রাজশাহী তালিকার শীর্ষে থাকা এই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় দুই শতাব্দী ধরে এই ভূখণ্ডে জ্ঞানের মশাল বহন করে চলেছে।
২. বরিশাল জিলা স্কুল (১৮২৯)
- প্রতিষ্ঠার সময়কার নাম: বারিসাল স্কুল
- অবস্থান: বরিশাল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই স্কুলটি দক্ষিণাঞ্চলে শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারে এক অনবদ্য ভূমিকা পালন করে আসছে।
৩. রংপুর জিলা স্কুল (১৮৩২)
- প্রতিষ্ঠার সময়কার নাম: রংপুর স্কুল
- অবস্থান: রংপুর উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন এই বিদ্যাপীঠটি তার गौरवময় ঐতিহ্য নিয়ে আজও অমলিন।
৪. ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল (১৮৩৫)
- প্রতিষ্ঠার সময়কার নাম: ঢাকা ইংলিশ স্কুল / ঢাকা সরকারি স্কুল
- অবস্থান: ঢাকা রাজধানী ঢাকার বুকে অবস্থিত এই স্কুলটি বাংলাদেশের বহু জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিত্বের জন্ম দিয়েছে।
৫. চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল (১৮৩৬)
- প্রতিষ্ঠার সময়কার নাম: চট্টগ্রাম ইংলিশ স্কুল
- অবস্থান: চট্টগ্রাম বন্দরনগরী চট্টগ্রামের এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি আধুনিক শিক্ষার প্রসারে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছে।
৬. কুমিল্লা জিলা স্কুল (১৮৩৭)
- প্রতিষ্ঠার সময়কার নাম: টিপরা স্কুল / কুমিল্লা স্কুল
- অবস্থান: কুমিল্লা ঐতিহ্য ও সাফল্যের ধারক এই স্কুলটি কুমিল্লার শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৭. যশোর জিলা স্কুল (১৮৩৮)
- প্রতিষ্ঠার সময়কার নাম: যশোহর স্কুল
- অবস্থান: যশোর যশোরের এই প্রাচীনতম স্কুলটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গঠনে সাহায্য করে চলেছে।
৮. ময়মনসিংহ জিলা স্কুল (১৮৪৬)
- প্রতিষ্ঠার সময়কার নাম: ময়মনসিংহ ইংলিশ স্কুল
- অবস্থান: ময়মনসিংহ ব্রহ্মপুত্রের তীরে অবস্থিত এই বিদ্যাপীঠটি ময়মনসিংহ অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারের পথিকৃৎ।
৯. বগুড়া জিলা স্কুল (১৮৫৩)
- প্রতিষ্ঠার সময়কার নাম: বগুড়া সরকারি ইংলিশ স্কুল
- অবস্থান: বগুড়া উত্তরবঙ্গের আরেকটি রত্ন এই স্কুলটি তার स्थापनाলগ্ন থেকেই সুনামের সাথে জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে।
১০. নওগাঁ জিলা স্কুল (১৮৬৪)
- প্রতিষ্ঠার সময়কার নাম: নওগাঁ স্কুল
- অবস্থান: নওগাঁ তালিকার দশম স্থানে থাকা এই প্রতিষ্ঠানটিও এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তার ঐতিহ্যকে সমুন্নত রেখেছে।
শুধু ইট-পাথরের দালান নয়, ইতিহাসের বাতিঘর
এই স্কুলগুলো কেবল শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেই তাদের দায়িত্ব শেষ করেনি। এগুলো ছিল এক একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু। এখান থেকেই বেরিয়ে এসেছেন বহু মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানী, শিল্পী ও লেখক, যারা বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশকে দিয়েছেন নেতৃত্ব। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর করিডোরে, খেলার মাঠে আর শ্রেণিকক্ষে লুকিয়ে আছে আমাদের জাতীয় ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
দেড় থেকে দুই শতাব্দী পরেও এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের এবং গর্বের। এই স্কুলগুলো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার শিকড়, যা সময়ের সাথে সাথে আরও শক্তিশালী হয়েছে। এই ঐতিহ্যকে রক্ষা করা এবং এর ইতিহাসকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

মন্তব্য করুন